আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশ বড় দুটি দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে একটি অগণতান্ত্রিক তৎপরতা রয়েছে এমন অভিযোগ করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়।
আজ (২৮ নভেম্বর) শুক্রবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত সজিব ওয়াজেদ জয়ের দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দুই দলেরই নেতৃত্ব পরিবর্তনে বিদেশ থেকে একটা খেলা চলছে।
বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বড় দল বলতে তিনি বিএনপিকে বুঝিয়েছেন, তবে খেলা বলতে আসলে কী বোঝাচ্ছেন এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত সে বিষয়টি পরিষ্কার করেননি।
তার দলের নেতৃত্বে শেখ হাসিনার পর তাদের পরিবারের কারো সরাসরি হাল ধরার সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন সজীব ওয়াজেদ।
শেখ হাসিনার অবর্তমানে কিংবা তার মায়ের পরে তিনি দলের নেতৃত্বে আসতে চান কি না, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, দলই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সজীব ওয়াজেদ বলেন, আমরা একটি গণতান্ত্রিক দল। ভবিষ্যত নেতৃত্ব কে হবে এটা দল নির্ধারণ করবে। আমি বা অন্যকেউ এটা উপর থেকে নির্দেশ দিয়ে পারি না।
যেটা এখন চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে দুই দলেরই নেতৃত্ব পরিবর্তন করার উপর থেকে বিদেশ থেকে একটা খেলা চলছে। এটা গণতান্ত্রিক না।
রিফাইন্ড’ ধারণা নিয়ে সন্দেহ
গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে রাজনীতিতে বড় সংকটের মধ্যে পড়েছে। ৫ই অগাস্টের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের দায়িত্বশীল অধিকাংশ নেতাই দেশে-বিদেশে আত্মগোপনে আছেন, অথবা কারাগারে আছেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর রাজনীতিতে তার ভবিষ্যত ও আওয়ামী লীগের পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে।
৫ই অগাস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে নতুন কারো নেতৃত্বে একটি ‘রিফাইন্ড বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ’কে রাজনীতিতে সক্রিয় করার বিষয়টি আলোচনায় আসে। যদিও রিফাইন্ড বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ ধারণার বিপক্ষে কঠোর একটা মনোভাব আছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুগত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে।
একটা রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ নিয়ে যে আলোচনা আছে, সেটা কীভাবে দেখেন এ প্রশ্নে সজীব ওয়াজেদ জয় বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ হচ্ছে সেই ওয়ান ইলেভেনের সময়ের যে বিষয়টা”। তখনো রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ, বিএনপির আলেচনায় এসেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে বড় দল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দুই দলেরই কেবল নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক আছে যা দেশের বাকি কোনো দলের নাই। বাংলাদেশে ক্ষমতায় এলে বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগ এই দুই দলের একটি আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ বাস্তবতায় কাদের ইচ্ছায় রিফাইন্ড এই প্রশ্ন তুলে সজীব ওয়াজেদ বলেন, “বিদেশি কয়েকটা দেশ, বিদেশি কয়েকটা শক্তি আর আমাদের সুশীল সমাজের কয়েকজন মিলে নির্ধারণ করবে যে কে প্রধানমন্ত্রী হলে রিফাইন্ড হবে, কে নেতা হলে রিফাইন্ড হবে।
বাংলাদেশের জনগণ এরকম কিছু চায় কি না এই প্রশ্ন তোলেন মি. ওয়াজেদ।
রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের যে আলোচনা হচ্ছে সেটার ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “বাইরে থেকে নির্ধারণ করা হবে যে- আওয়ামী লীগকে ফিল্টার করে কে যোগ্য নেতৃত্ব, আমরা বেছে দেব। মানুষের ভোটে না নেতাকর্মীদের ভোটে না। সেটাই হচ্ছে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র।
“তো রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ, বিএনপি এসবে আমি বিশ্বাস করি না। আমার বিশ্বাস গণতন্ত্রে, দল নির্ধারন করবে যে দলের নেতৃত্ব কে দেবে, দেশের মানুষ নির্ধারণ করবে যে দেশের নেতৃত্ব কে দেবে, বলেন তিনি।
আওয়ামী লীগের পরবর্তী নেতৃত্ব..
বর্তমানে ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা বা আলোচনাও নেই। দেশের মধ্যে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিবেশ নেই বলেও মন করছে আওয়ামী লীগ।
সজীব ওয়াজেদ বলেন, দলের নেতৃত্ব তো এখনো আছে।
“দলের সভাপতি হচ্ছেন আমার মা। উনাকে তো দলের নেতাকর্মীরাই সমর্থন করে রেখেছেন। কেউ উনাকে ছেড়ে যায়নি। হ্যাঁ, তারা বিচ্ছিন্ন আছে, তবে তারা কিন্তু ঐক্যবদ্ধ আছে। তো দলের নেতৃত্ব এখনো ইনট্যাক্ট আছে। আমাদের দল সম্পূর্ণভাবে ইউনাইটেড আছে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। নেতাকর্মীরা অধিকাংশই এলাকায় থাকতে পারছে না। মামলা, গ্রেফতার এবং মব আতঙ্কে দলের কোথাও কোনো তৎপরতা নেই। প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচি পালনেরও সুযোগ নেই।
এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের হয়ে বিদেশে সজীব ওয়াজেদ জয় নানাভাবে তৎপরতা চালাচ্ছেন। দলের নেতৃত্বে আসবেন কি না বিবিসি বাংলার এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটাও তার নিজের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভবিষ্যতে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।
“আমি আসলে সরাসরি কোনোদিন রাজনীতি করতে চাইনি। বাট এখন যে খেলা চলছে তাতে কী হবে তাতো কেউ বলতে পারে না। তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ তার নিজের নির্ধারণ করতে হবে, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্ধারন করতে হবে।
দলের বর্তমান পরিস্থিতি ও সংকট স্বীকার করে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে তার ইচ্ছা নেতৃত্ব দেওয়া নয়, বরং তার ভাষায় দেশে গণতন্ত্র ও শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করা। তার অভিযোগ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হুমকির মুখে সেটি রক্ষা করতে হবে।
“আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে এই দেড় বছরে যে নির্যাতন চলেছে, স্বাধীনতার চেতনা মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। এখনো চলছে বাংলাদেশে এটা মোকাবিলা করা। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা বাংলাদেশের মানুষ নির্ধারণ করবে। দলে কী হবে এটা দলের নেতাকর্মী নির্ধারণ করবে। আমার এখন যেটা ইচ্ছা, যেটা দায়িত্ব স্বাধীনতার চেতনাকে আমার রক্ষা করতে হবে।
সজীব ওয়াজেদ বলেন, “আওয়ামী লীগ একটা গণতান্ত্রিক দল। আমরা তো একটা রাজত্ব না যে আমরা নির্ধারণ করে দেবো কে নেতৃত্বে আসবে কে আসবে না। একমাত্র কিন্তু আওয়ামী লীগ একমাত্র দল যে কখনো বলে নাই যে শেখ হাসিনার পর কে আসবে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট ছাত্রজনতার তীব্র আন্দোলনের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডারদের হাতে প্রায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত ও ২৫ হাজারের বেশি আন্দোলনকারী শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারায়।
এবং এসব ঘটনায় শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তবর্তী সরকারের ক্ষমতায় এলে দেশব্যাপী হাসিনা, সাবেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আদালত শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে আদালত।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পেতে পেজে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন।
Leave a Reply